অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছেন। প্রস্তাবিত বাজেটের আকার দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৩.৭ শতাংশ। এটি চলতি অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী অর্থবছরে মোট উন্নয়ন ব্যয় বাড়িয়ে এবং পরিচালন ব্যয় তুলনামূলক কমিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকারি ব্যয়ের কাঠামোয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
যেসব পণ্যের দাম বাড়বে
তামাক ও মদ
ধূমপান নিরুৎসাহিত করতে প্রস্তাবিত বাজেটে তামাকজাত পণ্যের ওপর সবচেয়ে বেশি কর বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নিম্নস্তরের সিগারেটের ১০ শলাকার প্যাকেটের ন্যূনতম মূল্য ৬২ টাকা, মধ্যমস্তরের ৯২ টাকা, উচ্চস্তরের ১৬০ টাকা এবং অতি উচ্চস্তরের সিগারেটের মূল্য ২১০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশে উৎপাদিত মদে লিটারপ্রতি ৫০০ টাকা ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিকোটিন পাউচ, হিটেড টোব্যাকো ও অন্যান্য নিকোটিনজাত পণ্যের ওপর সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হয়েছে।
নির্মাণ সামগ্রী
নতুন অর্থবছরে এমএস রড ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের ওপর ভ্যাট ও কর প্রায় ১০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বাড়ি বা যেকোনো অবকাঠামো তৈরির খরচ বাড়তে পারে।
মোটরগাড়ি
১২০০ থেকে ১৬০০ সিসি ক্ষমতার মধ্যম সারির ডিজেল ও পেট্রোলচালিত গাড়ির মোট করহার ১৩২ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
আমদানিকৃত পণ্য
কাজু বাদাম আমদানিতে শুল্কহার ৫ শতাংশ থেকে একলাফে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে উচ্চমূল্যের আমদানিকৃত হিমায়িত মাছে ১৫ শতাংশ ভ্যাট পাঙ্গাস মাছের ফিলেটের ওপর ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব রয়েছে।
এর পাশাপাশি আমদানি করা হাউজহোল্ড ওয়াশিং মেশিনের ওপর নতুন করে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক, জিপসাম বোর্ড ও শিটের ওপর ২০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক, কোল্ড–রোল্ড কয়েল ও শিটের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক, কপার তারের ওপর ১০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক এবং কপার টিউবের শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
যেসব পণ্যের দাম কমবে
খাদ্যদ্রব্য: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, রসুন, আদাসহ ৬০টি কৃষিজাত ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎসে কর কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে এসব পণ্যে ১ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত উৎসে কর রয়েছে। নতুন বাজেটে তা কমিয়ে ০.৫ শতাংশে নামানোর কথা বলা হয়েছে। একইসঙ্গে দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গ, গোলমরিচসহ বিভিন্ন মসলা ও খেজুর আমদানির ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক তুলে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি শিশুখাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালের আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
কৃষি উপকরণ
কৃষি খাতে কীটনাশক ও বালাইনাশক উৎপাদনের ৩৬টি কাঁচামালের ওপর ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হচ্ছে। জিংক সালফেট সার উৎপাদনের কাঁচামালের আমদানি শুল্ক শূন্য করা হয়েছে। পোল্ট্রি, ডেইরি ও মাছের খাদ্য উৎপাদনের তিনটি কাঁচামাল শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। একই সঙ্গে এ খাতের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা
কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টারের ওপর ভ্যাট ও অগ্রিম কর সম্পূর্ণ মওকুফ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে এর ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ৫ শতাংশ অগ্রিম কর রয়েছে। পাশাপাশি হেমোডায়ালাইসিসে ব্যবহৃত ব্লাড টিউবিং সেটের ওপর আরোপিত সাড়ে ৭ শতাংশ অগ্রিম কর, হার্টের রিং বা স্টেন্ট সরবরাহের ওপর ১০ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে প্রতিটি স্টেন্টের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে। একইসঙ্গে চোখের ইন্ট্রাওকুলার লেন্সের ১০ শতাংশ ভ্যাট মওকুফের প্রস্তাব কার্যকর হলে প্রতিটি লেন্সের দাম প্রায় ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে।
প্রস্তাবিত বাজেটে ওষুধ শিল্পের দিকেও বিশেষ নজর দেয়া হয়েছে। ওষুধের কাঁচামাল এপিআই তৈরির ৫১টি নতুন উপকরণের আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে ক্যান্সারবিরোধী ওষুধ উৎপাদনের নতুন ৯টি কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে বাজারে ওষুধের দামে কমবে। এ ছাড়া বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের চলাচলে সহায়ক ২১ ধরনের যন্ত্রপাতি আমদানিতে সব ধরনের শুল্ক, ভ্যাট ও আগাম কর সম্পূর্ণ অব্যাহতির প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
কম্পিউটার ও সরঞ্জাম
প্রস্তাবিত বাজেটে ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, প্রিন্টার ও মনিটর আমদানির ক্ষেত্রে সমুদয় আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে কম্পিটারের সলিড–স্টেট ড্রাইভ বা এসএসডি আমদানির ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক ব্যতীত সমুদয় রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এতে এসব পণ্যের দাম কমবে।
দাম কমছে পয়েন্ট অব সেলস বা পস মেশিনেরও। এর আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সার্ভার আমদানিতে শুল্ক–কর অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে।
ইলেকট্রিক গাড়ি
নতুন বাজেটে দাম কমবে ইলেকট্রিক গাড়ি ও চার্জারের। প্রস্তাবিত বাজেটে ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত মূল্যের ইলেকট্রিক গাড়ির করভার ৯৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৪ শতাংশ এবং ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত গাড়ির করভার ৮০ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে ইলেকট্রিক গাড়ির চার্জার ও চার্জিং স্টেশনের ওপর বিদ্যমান ৩৯.৭৫ শতাংশ করভার সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এছাড়া ১৮০০ সিসি পর্যন্ত প্লাগ–ইন হাইব্রিড গাড়ির করভার ৯৩.১৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭৩.৪৩ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।
জুয়েলারি শিল্প
স্বর্ণ ও স্বর্ণের গহনার ক্ষেত্রে উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে এ খাতে করভার ৯০ শতাংশ কমবে।
সাংস্কৃতিক সরঞ্জাম
গিটার, পিয়ানো, ভায়োলিনসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র এবং এর যন্ত্রাংশ আমদানিতে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি উচ্চপ্রযুক্তির সিনেমা ক্যামেরার আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে।