সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করা দরকার। পাশাপাশি বিরোধী দলের উচিত, সংকট সমাধানে সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দেওয়া। সরকার যাতে এই পরামর্শের আলোকে দীর্ঘদিনের পদ্ধতিগত দুর্বলতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দ্রব্যমূল্য, দুর্নীতি ও জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ধানমন্ডির ‘বিলিয়া মিলনায়তনে‘ আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এ কথা বলেন।
‘বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের ১৮০ দিন: সুশাসন, জবাবদিহি ও উন্নয়নের প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক এই আলোচনার যৌথ আয়োজক সিটিজেনস ফোরাম বাংলাদেশ (সিএফবি) ও বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড ইনিশিয়েটিভস (বিসিএআই)।
আলোচনায় রাজনীতিক, কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা সরকারের প্রথম ৬ মাসের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করেন।
এতে সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) চেয়ারম্যান ও সিএফবি প্রধান সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ।
তিনি বলেন, “১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর এই সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের পদ্ধতিগত সমস্যার দায়ও মানুষ বর্তমান সরকারের ওপর দিচ্ছে।”
‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পরিকল্পনাগত ঘাটতি জনগণকে স্পষ্টভাবে জানাতে একটি ‘শ্যাডো’ পরিকল্পনা প্রকাশের পরামর্শ দিয়ে’ তিনি আরও বলেন, “সরকার আন্তরিকভাবে কাজ শুরু করেছে; এখন প্রয়োজন ফলাফল দেওয়ার জন্য সময় এবং সুশৃঙ্খল, পদ্ধতিগত বাস্তবায়ন।”
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, নতুন সরকারের মাত্র ৬ মাসের মধ্যে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি গুণগত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। গত ৫৫ বছরের সংসদীয় রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের স্থবিরতা থেকে দেশ নতুন গতিমুখ নির্ধারণ করেছে।
বর্তমান সরকার জ্বালানি আমদানির নতুন উৎস খোঁজার পাশাপাশি দেশের নিজস্ব জ্বালানি সম্পদ উত্তোলনের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছে বলে জানান জহির উদ্দিন স্বপন।
ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই)-এর রেসিডেন্ট প্রোগ্রাম ডিরেক্টর জন ফ্লুহার্টি বলেন, “সরকার ও বিরোধী দলকে ক্যামেরার বাইরে বসে সমস্যা নিয়ে আলোচনা ও সমঝোতার চেষ্টা করতে দেখা গেলে জনগণের আস্থা বাড়তে পারে।”
সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী বলেন, “মাত্র ১৮০ দিনে একটি সংসদীয় গণতন্ত্রের পূর্ণ মূল্যায়ন করা যায় না। সবকিছু লিখিত আইন দিয়ে পরিচালিত হয় না; অনেক কিছুই কনভেনশন ও রাজনৈতিক শিষ্টাচারের ওপর নির্ভর করে।”
গোলটেবিল আলোচনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির সমালোচনা করেন ‘নারীপক্ষ’–এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শিরীন পারভীন হক।
তিনি বলেন, বাজারে গিয়ে অনেক সময় মানুষ খালি ব্যাগ নিয়ে ফিরছে। দুর্নীতি এখন প্রায় সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, বর্তমান সরকার পরিবর্তনের জন্য পর্যাপ্ত সময় পায়নি। তবে প্রশাসনে অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক আধিপত্য দূর করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, “ক্ষমতা ও অর্থের আকর্ষণে মেধাবীদের পুলিশ–প্রশাসনমুখী প্রবণতা একটি সামাজিক ব্যাধি। সরকারের সাফল্য কোনো এক ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে না; এটি দলগত কাজ।”
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল হান্নান চৌধুরী বলেন, “গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা এবং বিপর্যস্ত অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। মানবসম্পদের রূপান্তর ঘটলে ভবিষ্যতে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি সম্ভব।”
আলোচনা সঞ্চালনা করেন প্রথিতযশা চিকিৎসক প্রফেসর ড. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্থ।
আয়োজকরা জানান, সুশাসন ও সংস্কার নিয়ে অবহিত জনআলোচনা এগিয়ে নেওয়ার ধারাবাহিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই গোলটেবিল আয়োজন করা হয়।
এসএ