বুধবার, জানুয়ারি ১৪, ২০২৬
বুধবার, জানুয়ারি ১৪, ২০২৬

ন্যায্যমূল্য ও মজুরি নিশ্চিত করা নির্বাচিত সরকারের বড় চ‍্যালেঞ্জ

Avatar photoদীপ্ত নিউজ ডেস্ক

বাংলাদেশে ন্যায্যমূল্য ও মজুরি নিশ্চিত না হওয়া নাগরিকদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতার অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, মানুষের আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য ক্রমেই নষ্ট হচ্ছে।

নভেম্বর ২০২৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, ৪০ দশমিক ৪ শতাংশ নাগরিক বলেছেন তারা এক বছর আগের তুলনায় ভালো অবস্থায় নেই। এর প্রধান কারণ হিসেবে আয় করার সুযোগ কমে যাওয়ার কথা বলেছেন ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কথা বলেছেন ১৭ শতাংশ। এই তথ্যগুলো দেখাচ্ছে, ন্যায্যমূল্য ও মজুরির প্রশ্নটি এখন সরাসরি নাগরিকদের জীবনমানের সঙ্গে যুক্ত।

বুধবার (১৪ জানুয়ারি) ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল ও যমুনা টেলিভিশনের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘ন্যায্যমূল্য ও মজুরি নিশ্চিত কীভাবে’ শীর্ষক সংলাপে এসব বাস্তবতা তুলে ধরা হয়।

আলোচনায় বলা হয়, ভোক্তারা একদিকে ন্যায্য দামে পণ্য পাওয়ার দাবিতে উদ্বিগ্ন, অন্যদিকে কৃষক ও শ্রমজীবীরা তাদের উৎপাদন ও শ্রমের উপযুক্ত মূল্য পাচ্ছেন না। ফলে বাজার, মজুরি ও জীবিকা, তিনটি বিষয়ই এক সংকটে এসে মিলেছে।

সংলাপে ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের চিফ অব পার্টি ক্যাথরিন সিসিল বলেন, নাগরিকদের উদ্বেগ এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়। মূল্যবৃদ্ধি, আয়সংকট ও মজুরি সব একসঙ্গে মানুষকে চাপে ফেলছে। তিনি বলেন, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের জরিপে আরও দেখা যাচ্ছে, ৩৩ শতাংশ ভোটার এখনো সিদ্ধান্তহীন। শুধু নারী ভোটারদের ক্ষেত্রে এই হার ৪৩ ভাগ। এই বাস্তবতা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা, নাগরিকরা প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবসম্মত ও বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা দেখতে চান।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদিকা হক বলেন, মালিক ও মধ্যস্বত্বভোগীরা সাপ্লাই চেইনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের বাদ দিলে অর্থনীতি চলবে না। বরং কার্যকরভাবে রেগুলেট করতে হবে, যাতে পণ্যের দাম অযৌক্তিকভাবে না বাড়ে এবং কৃষক ও ভোক্তা উভয়েই সুরক্ষা পায়।

কর্মজীবী নারীর অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক সানজিদা সুলতানা বলেন, সংসদ ও রাজনৈতিক আলোচনায় শ্রমিকদের বিষয়টি এখনও পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায় না। আলোচনার মাধ্যমে এটি বাড়ানো সম্ভব। বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে যে মজুরি বৈষম্য রয়েছে, তা দূর না হলে অর্থনীতি কাঙ্ক্ষিত গতি পাবে না।

বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল বাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ডা. মনীষা চক্রবর্তী বলেন, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের সময় মালিকপক্ষের মুনাফাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, শ্রমিকদের অধিকারের কথা উপেক্ষিত থাকে। অবকাঠামোর পেছনে বিপুল ব্যয়ের পরিবর্তে শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণে গণমুখী বাজেট বরাদ্দ এবং একটি আলাদা শ্রম কমিশন গঠনের দাবি জানান তিনি।

জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্থা শারমিন বলেন, শ্রম ও শ্রমশক্তির সংজ্ঞা নতুন করে ভাবতে হবে। শ্রমের যথাযথ স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন নিশ্চিত হলেই ন্যায্য মজুরি সম্ভব। তিনি বলেন, রাজনীতিবিদদের প্রতিশ্রুতি থেকে বের হয়ে কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়নে যেতে হবে এবং নতুন ধরনের পেশাজীবীদের প্রাতিষ্ঠানিক খাতে আনতে হবে।

জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধি, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে না আনলে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কৃষক ও ভোক্তার মাঝখানে থেকে যারা অনৈতিকভাবে লাভ করছে, তাদের কঠোরভাবে দমন করতে হবে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে তার দল পাশে থাকবে বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল–বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির সদস্য ইসরাফিল খসরু বলেন, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে মালিক ও শ্রমিকদের একসঙ্গে বসে আলোচনা করতে হবে। নিয়মিত স্টেকহোল্ডার কনসালটেশন জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির আওতায় নতুন ধরনের পেশাজীবীদের ফরমাল সেক্টরে আনতে হবে। একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় শ্রমিক খাত কৃষিকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার ওপর জোর দেন তিনি।

সংলাপ শেষে বক্তারা একমত হন, ন্যায্যমূল্য ও মজুরি নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের বাইরে গিয়ে কাঠামোগত সংস্কার, নিয়মিত সংলাপ এবং কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। নাগরিকদের প্রত্যাশা এখন স্পষ্ট, প্রতিশ্রুতি নয়, চাই দৃশ্যমান সিদ্ধান্ত ও বাস্তব পরিবর্তন।

আরও পড়ুন

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More