ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কলেজ ছাত্র–ছাত্রীদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে পাঠ্যক্রমে টেকনিক্যাল কোর্স যুক্ত করছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের তিনদিনব্যাপী এক কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস–চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. এ এস এম আমানুল্লাহ।
দেশের সবচেয়ে বড় উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত কলেজের সংখ্যা ২২৮৪টি। যাতে অধ্যয়ন করছে ৪০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা দেশের উচ্চ শিক্ষা গ্রহণকারী মোট শিক্ষার্থীর ৭০ শতাংশ। এদের বেশিরভাগই মধ্য ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। পুরনো ও গতানুগতিক সিলেবাসে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করার পর এদের বেশিরভাগই বেকার থাকে। কারণ কারিগরী বিষয় ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার অভাব।
এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীকে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মত দক্ষ করে গড়ে তুলতে কারিকুলাম আধুনিক ও সময়োপযোগী করার পাশাপাশি টেকনিক্যাল কোর্স যুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন বিষয়ে BNFQ-এর নীতিমালা অনুসরণ করে Outcome based কারিকুলাম রিভিউ ও আপডেট কার্যক্রম পরিচালনা করছে। স্নাতক শিক্ষার্থীদের জন্য ২য় বর্ষে অ্যাডভান্সড আইসিটি কোর্স এবং ৩য় ও ৪র্থ বর্ষে কর্মমুখী দক্ষতাভিত্তিক বিভিন্ন কোর্স অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে Artificial Intelligence, Social Business, Digital Enterprenuership, Data Analytics, Computer Programming বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর পাশাপাশি Cyber Security, Digital Wellbeing-এর মতো সচেতনতামূলক বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, যাতে আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নিজেদেরকে প্রস্তুত রাখতে পারে। Digital Communication, Cognitive Empowerment, Time Management, Productivity, Presentation, Leadership এবং Financial Literacy-এর মতো soft skills-এর বিষয়সমূহ গুরুত্বের সাথে যুক্ত করা হচ্ছে, যাতে শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক দক্ষতা বৃদ্ধি পায় এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রম বাজারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তারা অধিকতর সক্ষম হয়। যুগোপযোগী এই উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়নে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের এটুআই প্রোগ্রাম এবং ইউনিসেফ বাংলাদেশ সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করছে।
এই কারিকুলাম উন্নয়ন প্রক্রিয়া অংশগ্রহণমূলক করতে তিনদিনব্যাপী কর্মশালা আয়োজন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে এ কর্মশালা উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন, এমপি।
তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাপনার সমস্যা, সংকট ও প্রতিবন্ধকতা নিরসনে ১৯৯২ সালে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘদিনেও সেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হয়নি। তবে আশার কথা হলো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন কর্মমুখী শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে একটি বিস্তৃত ও সময়োপযোগী শিক্ষাক্রম সংস্কারের যুগান্তকারী কার্যক্রম গ্রহণ করেছে, যা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
শিক্ষামন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, তিন দিনের এই কর্মশালায় বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কলেজ অধ্যক্ষ, শিক্ষক–শিক্ষার্থী এবং শিল্প উদ্যোক্তাদের সম্মিলিত প্রয়াসে একটি সময়ের প্রয়োজনভিত্তিক কারিকুলাম প্রণয়ন করা হবে, যা শিক্ষার্থীদের কর্মমুখী হওয়ার সুযোগ বাড়াবে এবং তরুণ–তরুণীদের মাঝে উদ্ভাবনী চিন্তা জাগাবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সভাপতি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস–চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. এ এস এম আমানুল্লাহ বলেন, স্বাধীনতার পর শিক্ষায় যথাযথ বিনিয়োগ না করায় দেশ এখনো সমসাময়িক অন্যান্য দেশের চেয়ে পিছিয়ে আছে। তাই বিলম্ব হলেও শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেয়ার সময় এখনই।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থীদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে গৃহীত নানা ধরণের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, শিক্ষা ও গবেষণায় গুণগত মানোন্নয়নের লক্ষ্যে গত পৌনে দুই বছরে প্রায় ৩০টি আন্তর্জাতিক ও দেশীয় স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানের সাথে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
প্রফেসর আমানুল্লাহ বলেন, শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও মৌলিক দক্ষতা উন্নয়নে এরইমধ্যে স্নাতক পর্যায়ে ইংরেজি, বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরিচয় এবং আইসিটি বিষয় বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তিনি বলেন, বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শেখানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে। অগ্রসর শিক্ষা ও গবেষণার জন্য বিশ্বমানের একটি ফরেনসিক ল্যাব প্রতিষ্ঠার চিন্তা আছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের।
প্রফেসর আমানুল্লাহ বলেন, অদূর ভবিষ্যতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিশ্ব আঙিনায় দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে বড় ভূমিকা রাখবে। কারণ সরকারের সহযোগিতায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন বিশ্বস্বীকৃত আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতি প্রবর্তনের চেষ্টা করছে। যা দক্ষ, চাকরিতে প্রবেশের যোগ্য ও ভবিষ্যত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম জনবল তৈরি করবে। এরআগে তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা কার্যক্রম ও ইতোমধ্যে গৃহিত উদ্যোগ সংক্রান্ত তথ্য উপস্থাপন করেন।
তিন দিনব্যাপী কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আব্দুল খালেক, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ও এটুআই প্রকল্প পরিচালক মোঃ আব্দুর রফিক এবং ইউনিসেফ বাংলাদেশের ডেপুটি রিপ্রেজেন্টেটিভ এমানুয়েল আব্রিউক্স।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো ভাইস–চ্যান্সেলর প্রফেসর মো. লুৎফর রহমান অনুষ্ঠানে আগত অতিথিদের ধন্যবাদ জানান। এছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার প্রফেসর ড. এ টি এম জাফরুল আযম, রেজিস্ট্রার মোল্লা মাহফুজ আল–হোসেন, বিভিন্ন অনুষদের ডিন, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, বিভাগীয় প্রধান ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং এর প্রতিষ্ঠাতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ওপর দুটি তথ্য চিত্র প্রদর্শন করা হয়।