বুধবার, এপ্রিল ৮, ২০২৬
বুধবার, এপ্রিল ৮, ২০২৬

জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি দিয়ে সংসদে বিল পাস

Avatar photoদীপ্ত নিউজ ডেস্ক

২০২৪ সালের জুলাইআগস্টের আন্দোলনকারীদের দায়মুক্তির বিধান রেখে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) আইন, ২০২৬’ বিল সংসদে পাস হয়েছে। এর ফলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্রজনতা আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা পাবেন।

বুধবার (৭ এপ্রিল) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের একাদশ দিনে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস করা হয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যদেশের এই বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ।

এই আইন পাসের ফলে গত বছরের জুলাইআগস্ট মাসে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল ধরনের দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা এবং আইনি কার্যধারা স্থায়ীভাবে প্রত্যাহারের পথ প্রশস্ত হলো। পাস হওয়া বিলের বিধান অনুযায়ী, নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট সকল অভিযোগ অবিলম্বে বাতিল করা হবে।

শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে এই অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নতুন করে কোনো মামলা দায়ের বা কোনো প্রকার আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে তা আইনত বাধা বা বারিত হিসেবে গণ্য হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রাজপথের বিপ্লবীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলো।

এ বিলে বলা হয়েছে ২০২৬ সালের ২৫ জানুয়ারি কার্যকর হয়েছে বলিয়া গণ্য হবে এবং ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে বলবৎ হয়েছে বলে গণ্য হবে।

বিলের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘গণঅভ্যুত্থানকারী’ অর্থ ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে ছাত্রজনতার সম্মিলিত আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সংঘটিত অভ্যুত্থানের পক্ষে অংশগ্রহণকারী যেকোনো ব্যক্তি। আইনের বিশেষ তফসিলে ‘রাজনৈতিক প্রতিরোধ’ বলতে ফ্যাসিস্ট শাসকের পতন ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে পরিচালিত সকল কার্যাবলিকে বোঝানো হয়েছে। তবে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য সংঘটিত হত্যাকাণ্ডকে ‘বিশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অপরাধমূলক অপব্যবহার’ হিসেবে চিহ্নিত করে তা এই সুরক্ষার আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।

এ বিষয়ে বলা হয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে কোনো গণঅভ্যুত্থানকারীর বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ থাকলে তা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে দাখিল করা যাবে এবং কমিশন ওই অভিযোগ তদন্তের ব্যবস্থা নেবে।

সংসদে পাস হওয়া এই আইনের অন্যতম শক্তিশালী দিক হলো এর শ্রেষ্ঠত্ব বা ওভাররাইডিং ক্ষমতা। বিলে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বর্তমানে বলবৎ অন্য কোনো আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন, এই আইনের বিধানাবলিই প্রাধান্য পাবে। এর ফলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণের কারণে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অতীতে দায়েরকৃত সকল দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা, অভিযোগ বা আইনি কার্যধারা নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হবে।

একইসঙ্গে আইনের ৫ নম্বর ধারার বিধান সাপেক্ষে, অভ্যুত্থানসংশ্লিষ্ট কোনো ঘটনার জন্য অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে নতুন কোনো মামলা বা অভিযোগ দায়ের করা আইনত নিষিদ্ধ বা বারিত করা হয়েছে। এই আইনি রক্ষাকবচ মূলত বিপ্লবীদের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে আজীবনের জন্য মুক্তি প্রদান করল।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে অত্যন্ত জোরালোভাবে বলা হয়েছে যে, ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে বাংলাদেশের ছাত্রজনতা ফ্যাসিস্ট শাসকের পতন ঘটিয়ে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে সর্বাত্মক সংগ্রাম করেছে, তা রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ হিসেবে স্বীকৃত। ফ্যাসিবাদী সরকারের নির্দেশে পরিচালিত নির্বিচার হত্যাকাণ্ড ও সশস্ত্র আক্রমণ প্রতিরোধের সময় আত্মরক্ষা এবং জনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের স্বার্থে আন্দোলনকারীরা যে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তাকে সাংবিধানিক বৈধতা দেওয়া হয়েছে।

বিল উত্থাপনের সময় আপত্তি তুলে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, বিলে ‘কমিশন’ বলতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে বোঝানো হয়েছে। আবার সংজ্ঞা অংশে ‘বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির অপরাধমূলক অপব্যবহার’ এবং ‘রাজনৈতিক প্রতিরোধ’ আলাদা করে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

এনসিপির এ সদস্যের প্রশ্ন ছিল, সঙ্কীর্ণ ও ব্যক্তিগত স্বার্থে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড আর রাজনৈতিক প্রতিরোধের অংশ হিসেবে সংঘটিত কার্যাবলির মধ্যে পার্থক্য কে নির্ধারণ করবে?

তিনি বলেন, প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী এটি নির্ধারণের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপরই পড়ছে। কিন্তু মানবাধিকার কমিশনের বর্তমান কাঠামো যদি সরকারনিয়ন্ত্রিত থাকে, তাহলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানপরবর্তী ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ অনুসন্ধান প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে মন্ত্রণালয়ের অধীনে রেখে এ ধরনের সংবেদনশীল অনুসন্ধানের দায়িত্ব দিলে তা নিয়ে আস্থা তৈরি হবে না। কমিশনকে স্বতন্ত্র ও স্বশাসিত করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, তা না হলে এই আইন কাগজে থাকলেও বাস্তবে এর কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাবে।

তিনি আরও বলেন, সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণের অভিযোগ যখন উঠছে, তখন মানবাধিকার কমিশনও একইভাবে প্রভাবিত হবে না, সেই নিশ্চয়তা নেই। তার ভাষায়, ‘কমিশন স্বাধীন না হলে জুলাইসংক্রান্ত সুরক্ষার এই কাঠামোও কার্যকর হবে না।’

এর জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের সাংবিধানিক ও আইনি সুরক্ষা দেওয়া এখন জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়েছে। এ বিসয়ে তার ভাষ্য, ‘জুলাই যোদ্ধাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই এ উদ্যোগ এসেছে এবং জুলাই জাতীয় সনদেও এ বিষয়ে অঙ্গীকার রয়েছে।’

মন্ত্রী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্রজনতার ওপর ‘গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগ এবং তাদের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ নিপীড়ন চালিয়েছিল। প্রতিরোধের মুখে অনেকে প্রাণও হারিয়েছেন। সেই বাস্তবতায় তাদের জন্য আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা দরকার বলেই সরকার এই অধ্যাদেশ জারি করেছিল।

তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বিল নিয়ে কারও সংশোধনী থাকলে তা আগের ধাপে আনা যেত। এই পর্যায়ে এসে মূল নীতিগত প্রশ্ন তুলে বিল উত্থাপন ‘ঠেকানোর’ সুযোগ নেই।

মানবাধিকার কমিশন বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকার একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন করতে চায়। তবে গুমবিরোধী আইন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালসংক্রান্ত আইন এবং মানবাধিকার কমিশনের কাঠামোর মধ্যে কিছু মিল ও ‘ওভারল্যাপ’ আছে। সে কারণে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ কাঠামো চূড়ান্ত করতে হবে।

তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা ব্যবস্থার কিছু সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। সেই কারণেই বিলটি আনা হয়েছে।

আরও পড়ুন

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More