জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারে (জেআইসি) সেলে গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় শেখ হাসিনাসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ইকবাল চৌধুরীর সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য ৩০ মার্চ দিন ধার্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল– ১। এ মামলায় আসামি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩ জন।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে এ সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এর আগে গত ২ মার্চ ট্রাইব্যুনালে নিজের গুম হওয়ার বীভৎস বর্ণনা দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ৭১ বছর বয়সী ইকবাল চৌধুরী।
একপর্যায়ে অসুস্থতা বোধ করায় প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তার সাক্ষ্যগ্রহণ অসমাপ্ত রেখে আজ সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।
সেদিন দেওয়া জবানবন্দিতে ইকবাল চৌধুরী জানান, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন জাতীয় ইস্যু নিয়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখালেখি করতেন। ২০১৮ সালের ৭ মে রাত ১১টার দিকে মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ এলাকায় তার ভাড়া বাসায় সাদা পোশাকধারী কয়েকজন ব্যক্তি হাজির হন। তার স্ত্রী দরজা খুললে তারা জানতে চান তিনি বাসায় আছেন কি না। একপর্যায়ে তাকে নিজেদের পরিচয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হিসেবে দিয়ে সঙ্গে যেতে বলেন। এরপর তাকে জোরপূর্বক নিচে নামিয়ে একটি সাদা মাইক্রোবাসে তোলা হয়।
গাড়িতে ওঠানোর পর তার চোখ বেঁধে হাতকড়া পরানো হয় এবং মাথায় টুপি পরিয়ে দেওয়া হয়। তাকে বলা হয়, জিজ্ঞাসাবাদের সময় সত্য না বললে ক্রসফায়ারের মাধ্যমে হত্যা করে লাশ গুম করা হবে। প্রায় ২০ থেকে ৩০ মিনিট চলার পর গাড়িটি একটি গেটের ভেতরে প্রবেশ করে। সেখানে তাকে নামিয়ে প্রথমে নাম জিজ্ঞাসা করা হয় এবং রক্তচাপ পরীক্ষা করা হয়। পরে চোখের বাঁধন ও হাতকড়া খুলে পোশাক পরিবর্তন করতে বাধ্য করা হয়।
তিনি জানান, তাকে প্রায় ৮ থেকে ১০ ফুটের একটি কক্ষে রাখা হয়, যেখানে একটি ছোট চৌকি, পুরোনো বালিশ ও ময়লা চাদর ছাড়া আর কিছু ছিল না। কক্ষের দেয়ালে পলেস্তারা ছিল না এবং সারাক্ষণ একটি বাতি জ্বলত। একটি বড় বায়ুনিষ্কাশন যন্ত্র থেকে তীব্র শব্দ হতো। লোহার শিক ও কাঠের দরজা বন্ধ করে তাকে একা রেখে দেওয়া হয়। সেই অবস্থায় নিজেকে জীবন্ত কবরের ভেতরে আটকে পড়ার মতো মনে হয়েছিল বলে জানান তিনি।
এই মামলার ১৩ আসামির মধ্যে বর্তমানে গ্রেপ্তার রয়েছেন তিনজন। তারা হলেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী।
পলাতক ১০ আসামির মধ্যে পাঁচজন বিভিন্ন সময়ে ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তারা হলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব.) সাইফুল আবেদিন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী এবং মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক।
এছাড়া মামলার অন্য আসামিরা হলেন– শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষাবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ তৌহিদুল উল ইসলাম, মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মখছুরুল হক।
গুমের এ ঘটনায় গত বছরের ৮ অক্টোবর ১৩ জনের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। পরে ১৮ ডিসেম্বর অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার কার্যক্রম শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়।