জাতীয় সরঞ্জাম পরিচয় নিবন্ধন ব্যবস্থা (এনইআইআর) চালুর পর দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত ‘ক্লোন’ ও নকল ফোন নিয়ে বিস্ময়কর ও উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে। সরকারি ও অপারেটর পর্যায়ে প্রাপ্ত তথ্য–উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চারটি মোবাইল অপারেটরের নেটওয়ার্কে বর্তমানে লাখ লাখ ভুয়া ও ডুপ্লিকেট আইএমইআই নম্বর সচল রয়েছে, যেগুলোর বড় অংশই কখনো কোনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের নিরাপত্তা পরীক্ষার আওতায় আসেনি।
তথ্য অনুযায়ী, ‘0000000000000’, ‘1111111111111’, ‘9999999999999’ — এমন অস্বাভাবিক ও অবাস্তব প্যাটার্নের আইএমইআই নম্বর এখনও সক্রিয় রয়েছে নেটওয়ার্কে।
তবে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এসব আইএমইআই এই মুহূর্তে ব্লক করা হচ্ছে না; বরং গ্রে হিসেবে ট্যাগ করা হচ্ছে, যাতে হঠাৎ করে ফোন বন্ধ হয়ে সাধারণ গ্রাহকের ভোগান্তি না বাড়ে।
শনিবার (৩ জানুয়ারি) ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহম্মদ জসীম উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের নাগরিকদের কাছে এভাবে আন–অফিশিয়াল নতুন ফোনের নামে নকল ফোন বিক্রি করা হয়েছে, এমন প্রতারণা অভাবনীয়, নজিরবিহীন। জনস্বার্থে এই চক্রের লাগাম টানা জরুরি।’
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ১০ বছরে শুধুমাত্র একটি আইএমইআই নম্বর ‘99999999999999’-এর বিপরীতে বিভিন্ন কম্বিনেশনে ৩ কোটি ৯১ লাখ ২২ হাজার ৫৩৪টি সংযোগ পাওয়া গেছে। স্মার্টফোনের পাশাপাশি এসব আইএমইআই বিভিন্ন আইওটি ডিভাইসেও ব্যবহৃত হতে পারে, তবে অপারেটররা মোবাইল সেট, সিম–সংযুক্ত ডিভাইস ও আইওটি ডিভাইসের আইএমইআই আলাদাভাবে শনাক্ত করতে পারছে না।
তালিকার শীর্ষে থাকা কয়েকটি আইএমইআই নম্বরের বিপরীতে পাওয়া ডিভাইসের সংখ্যা আরও চমকপ্রদ। যেমন, ‘440015202000’ নম্বরের বিপরীতে রয়েছে ১৯ লাখ ৪৯ হাজার ৮৮টি ডিভাইস, ‘35227301738634’ নম্বরের বিপরীতে ১৭ লাখ ৫৮ হাজার ৮৪৮টি, ‘35275101952326’ নম্বরের বিপরীতে ১৫ লাখ ২৩ হাজার ৫৭১টি এবং ‘0’ আইএমইআই নম্বরের বিপরীতে রয়েছে ৫ লাখ ৮৬ হাজার ৩৩১টি ডিভাইস। এভাবে শতাধিক ভুয়া ও ডুপ্লিকেট আইএমইআই নম্বরের বিপরীতে লাখের বেশি ডিভাইস নেটওয়ার্কে সক্রিয় রয়েছে বলে জানা গেছে।
এই বিপুলসংখ্যক নকল ও ক্লোন ফোনের বড় অংশই কখনো রেডিয়েশন টেস্ট, স্পেসিফিক অ্যাবসরপশন রেট (এসএআর) টেস্টসহ কোনো আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যায়নি। ফলে জনস্বাস্থ্য ও তথ্যনিরাপত্তা—উভয় ক্ষেত্রেই বড় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ৭৩ শতাংশ ডিজিটাল জালিয়াতি ঘটে অনিবন্ধিত ডিভাইসে। অন্যদিকে বিটিআরসি ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ তথ্যে দেখা যায়, ২০২৩ সালে সংঘটিত ই–কেওয়াইসি জালিয়াতির ৮৫ শতাংশই ঘটেছে অবৈধ বা পুনঃপ্রোগ্রাম করা হ্যান্ডসেট ব্যবহার করে। একই বছরে দেশে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার ফোন চুরির রিপোর্ট হয়েছে, যার বড় অংশই এখনো উদ্ধার হয়নি।