শুক্রবার, ২৬শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১২ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার, ২৬শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১২ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আশুরার রোজা একদিন রাখা যায় না কেন?

Avatar photoদীপ্ত নিউজ ডেস্ক

মুসলিম সমাজে আশুরার রোজা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। তবে আশুরার রোজা একদিন রাখা যথেষ্ট, নাকি দুইদিন রাখা আবশ্যক এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা দেখা যায়।

হাদিস, ফিকহ, মুজতাহিদ ইমামদের ব্যাখ্যা এবং সমকালীন ফতোয়া বোর্ডগুলোর সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করলে এ বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান পাওয়া যায়।

আশুরার রোজার ভিত্তি সহিহ হাদিস দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় এসে দেখতে পান, ইহুদিরা ১০ মহররমে রোজা পালন করছে। কারণ জানতে চাইলে তারা জানায়, এ দিন আল্লাহ তাআলা হজরত মুসা আ. ও বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউনকে ধ্বংস করেছিলেন।

তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মুসার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক তোমাদের চেয়ে অধিক।’ এরপর তিনি নিজে আশুরার রোজা পালন করেন এবং সাহাবিদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দেন। (সহিহ বুখারি: ২০০৪, সহিহ মুসলিম: ১১৩০)

এই হাদিসে আশুরার মূল রোজা হিসেবে ১০ মহররমের রোজাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে এ দিন রোজা রেখেছেন এবং এর প্রতি বিশেষ উৎসাহ দিয়েছেন। পরবর্তীতে তিনি আশুরার রোজার ফজিলত সম্পর্কে বলেন, আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার দিনের রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে। (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)

অর্থাৎ আশুরার দিনের রোজা নিজেই একটি স্বতন্ত্র সুন্নত এবং মহান ফজিলতের আমল।

তবে জীবনের শেষ দিকে রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন। হজরত ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমি যদি আগামী বছর জীবিত থাকি, তাহলে অবশ্যই নবম তারিখও রোজা রাখব। (সহিহ মুসলিম: ১১৩৪)

এই হাদিসের ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিস ও ফকিহরা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ১০ মহররমের রোজা বাদ দেওয়ার কথা বলেননি, বরং ১০ তারিখের সঙ্গে ৯ তারিখ যুক্ত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।

তার উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম উম্মাহকে ইহুদিদের থেকে স্বতন্ত্র পরিচয় দেওয়া এবং ইবাদতে অতিরিক্ত গুরুত্বারোপ করা।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, রাসুলুল্লাহ (সা.) এই ইচ্ছা প্রকাশ করার পরবর্তী মহররম আসার আগেই ইন্তেকাল করেন। ফলে তিনি বাস্তবে ৯ ও ১০ মহররম একত্রে রোজা পালন করতে পারেননি। কিন্তু তার এই ইচ্ছা ও নির্দেশনা থেকেই ফকিহগণ দুইদিন রোজা রাখাকে অধিক উত্তম বলে উল্লেখ করেছেন।

চার মাজহাবের ইমামদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোনো মাজহাবই শুধু ১০ মহররমের রোজাকে অগ্রহণযোগ্য বলেনি। হানাফি, মালেকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি সব মাজহাবের আলেমরা একমত যে শুধু ১০ মহররমের রোজা রাখলেও আশুরার সুন্নত আদায় হয়ে যায় এবং এর ফজিলত লাভ করা যায়। তবে ৯ ও ১০ মহররম একত্রে রোজা রাখা অধিক উত্তম এবং সুন্নতের অধিক পরিপূর্ণ অনুসরণ।

ইমাম নববী রহ. আশুরার রোজার স্তর বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, সর্বোত্তম হলো ৯, ১০ ও ১১ মহররম তিনদিন রোজা রাখা। এরপর ৯ ও ১০ মহররম। এরপর ১০ ও ১১ মহররম। আর শুধু ১০ মহররম রোজা রাখাও সুন্নত ও ফজিলতপূর্ণ।

সমকালীন বিশ্বের প্রধান ফতোয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থানও একই। মিশরের দারুল ইফতা, সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটি, দারুল উলুম দেওবন্দ, পাকিস্তানের মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি, শাইখ ইবনু বায, শাইখ ইবনু উসাইমীনসহ অসংখ্য আলেম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে শুধু ১০ মহররমের রোজা রাখা বৈধ, সুন্নত এবং ফজিলতপূর্ণ। তবে ৯ ও ১০ মহররম একত্রে রোজা রাখা অধিক উত্তম।

রাসূলুল্লাহ (সা.) এর ইচ্ছা, সাহাবিদের আমল এবং ফকিহদের ব্যাখ্যার আলোকে ৯ ও ১০ মহররম একত্রে রোজা রাখা অধিক উত্তম, অধিক পরিপূর্ণ এবং সুন্নতের আরও নিকটবর্তী আমল।

ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই যে, এটি মানুষের জন্য সহজতা ও ভারসাম্যের পথ উন্মুক্ত রাখে। যে ব্যক্তি দুইদিন রোজা রাখবেন, তিনি অতিরিক্ত সওয়াব ও সুন্নতের পূর্ণতার দিকে অগ্রসর হবেন। আর যে ব্যক্তি শুধু ১০ মহররম রোজা রাখবেন, তিনিও আশুরার সুন্নত থেকে বঞ্চিত হবেন না।

উভয় আমলই শরিয়তের স্বীকৃত পরিসরের অন্তর্ভুক্ত, তবে মর্যাদার দিক থেকে দুইদিন রোজা রাখা অধিক উত্তম ও অধিক পরিপূর্ণ সুন্নত।

আরও পড়ুন

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More