বিজ্ঞান–কল্পকাহিনি লেখক ফিলিপ কে. ডিক বলেছেন—
“বাস্তবতাকে বদলানোর মূল হাতিয়ার হলো শব্দকে বদলে ফেলা। শব্দের অর্থ তোমার নিয়ন্ত্রণে থাকলে, যারা শব্দ ব্যবহার করে তাদেরও নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে।”
ফিলিপ কে. ডিক–এর উক্তিটি বোঝাতে চেম্বারে আসা একজনের কথোপকথন দিয়েই শুরু করছি:
“সব সময় ভয় লাগে। ভুল কিছু করব না তো?”
ভদ্রমহিলা ফিসফিস করে, মৃদু—কিছুটা বাধোবাধো, তটস্থ অথচ অসাধারণ মার্জিত কণ্ঠে বললেন। খুব সাধারণ একটি আটপৌরে শাড়ি পরনে। কিন্তু এর দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। কোনো প্রসাধনী বা অলংকারের চিহ্ন নেই শরীরে। কপালজুড়ে অকালবার্ধক্যের বলিরেখা। মার্জিত কণ্ঠস্বরে কোথায় যেন একটি বনেদিয়ানা লুকিয়ে আছে।
মৃদুস্বরে জানতে চাইলাম, “কী ভুল?”
তার উত্তর: “বাজার বেশি নিলে, ফোন করলে, আমার বাবার বাসার কাউকে দেখতে গেলে…”
এটুকু বলেই থমকে গেলেন।
বেশ বুঝতে পারছি, একজন অপরিচিত মানুষের সামনে পারিবারিক এই কথাগুলো বলতে তার আত্মমর্যাদায় লাগছে। নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরলেন দাঁত দিয়ে। ভদ্রমহিলার মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইলাম।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি আবার শুরু করলেন, “তিনি, মানে আমার স্বামী রাগ করেন। বলেন, তোমার বুদ্ধি নেই। যখনই নিজের বুদ্ধি খাটাও তখনই তো গোলমাল করো। তোমাকে দিয়ে যদি কোনো একটা কাজ হয়!”
খেয়াল করলাম ভদ্রমহিলা একই টোনে কথাগুলো বলে গেলেন। তার মানে এই কথাগুলো বহুবার তাকে শুনতে হয়েছে।
চোখে চোখ রেখে তাকে স্পষ্ট প্রশ্ন করলাম, “আপনি কি তাই বিশ্বাস করেন?”
ক্লান্ত গলায় প্রত্যুত্তর: “আমার নিজের ওপর আর কোনো বিশ্বাস অবশিষ্ট নেই। সব সময় তাঁর কথাই ঠিক মনে হয়। কেমন যেন হারিয়ে যাচ্ছি। আমি নিজেই ডাক্তার, কিন্তু এই পরিস্থিতিতে কী করব বুঝতে পারছি না। মনে হচ্ছে নিজেই এক রোগী, যার কেস স্টাডি নিয়ে বসেছি আপনার সামনে।”
“শুরুটা কীভাবে হয়েছিল বলবেন? স্বামীর সাথে পরিচয়?”
ভদ্রমহিলা বললেন, “আমরা প্রেম করে বিয়ে করেছি। আমার পরিবার রাজি ছিল না, উনি আমার চেয়ে অনেক সিনিয়র। আমার দাদা, নানা, বাবা সবাই তাদের সমসাময়িক অতি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। আবার আমার মা, নানি–দাদিমা সবাই কলেজে অথবা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতা করতেন। কিন্তু প্রেম তো কোনো বাধা মানে না। তখন সবকিছু রোমান্টিক, সাহসী মনে হচ্ছিল। উনি খুব কেয়ারিং, প্রটেক্টিভ লাগত। প্রথম দিকে…”
আবার তিনি থেমে গেলেন। তাঁর শরীরটা ঘরের মধ্যে থাকলেও মনটা অন্য কোথাও যেন উধাও হয়ে গেছে।
কিছুক্ষণ পরে আবার ফিরে তাকালেন তিনি।
এবার প্রশ্ন করলাম, “তারপর কী পরিবর্তন এলো?”
তার উত্তর: “প্রথমে ছোটখাটো সমালোচনা। যেমন, তুমি এত বড় ডাক্তার হয়েও রান্নাটা একটু ভালো শিখো না? তারপর আমার ফোন চেক করা, ফেসবুকে কোনো পুরুষ বন্ধু থাকলে রেগে যাওয়া। ধীরে ধীরে, আমার সব বন্ধু, এমনকি মেডিকেল কলেজের সেরা বন্ধুটার সাথেও যোগাযোগ ছিন্ন করে দিল। বলতেন, ‘ওরা আমাদের সম্পর্কে জেলাস। ওদের সাথে মিশলে আমাদের নিজেদের সম্পর্ক খারাপ হবে।’ অথচ জানেন, আমি পরীক্ষায় দ্বিতীয় কবে হয়েছি মনে করতে পারি না। জেলাস যখন হওয়ার তখনই হতে পারত বন্ধুরা। আমার বন্ধুরা আমাকে ভীষণ ভালোবাসত।”
ভদ্রমহিলার চোখের কোণ থেকে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ার আগেই উনি শক্ত হাতে পানিটা মুছে ফেললেন।
এরপর আবার বলতে শুরু করলেন: “এটাই সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর! হাসপাতালে আমি সম্পূর্ণ অন্য মানুষ। সেখানে আমার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। কিন্তু বাড়িতে… কোন সেমিনারে যাব, কোনটা যাব না; কাকে বলব ‘হ্যালো’, কাকে বলব না—সবকিছুর একটা ‘অদৃশ্য রূপরেখা’ তৈরি করে দিয়েছেন আমার স্বামী। এমনকি আমার ইনকামের টাকাও এখন ‘আমাদের’ জয়েন্ট অ্যাকাউন্টে যায়, ব্যাংকের চেকবই বা পাসবইতে আমার আলাদা এক্সেস খুবই সীমিত। জমিজমার ক্ষেত্রেও তাই।”
“এই অদৃশ্য শিকলগুলো আপনি আগে কেন ভাঙার চেষ্টা করলেন না?”
ভদ্রমহিলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “কারণ, এসবের মাঝে মাঝে আগের সেই ভালোবাসার, কেয়ারের ছিটেফোঁটা দেখা যায়! আবার উনি খুব সাপোর্টিভও। বলতেন, আমার ক্যারিয়ারের ব্যাপারে। মনে হতো, হয়তো আমিই ভুল বুঝছি। হয়তো উনিই ঠিক, বাইরের দুনিয়া আসলেই বিপজ্জনক। কিন্তু…”
আমি এই ‘কিন্তু’ শব্দটি শোনার জন্যই ঘাপটি মেরে বসে ছিলাম। যে মুহূর্তে উনি ‘কিন্তু’ শব্দটি উচ্চারণ করলেন, আমি টপ করে ধরে ফেললাম।
“কিন্তু…?”
চোখে চিকচিকে পানি নিয়ে তিনি বললেন, “গত মাসে একটা ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্সে পেপার উপস্থাপনের জন্য নির্বাচিত হলাম। সেটা আমার ক্যারিয়ারের জন্য বিশাল ব্যাপার। অথচ আমার স্বামী স্পষ্ট বলে দিলেন, যেতে দেবেন না। কারণ, ওখানে কাদের না কাদের সাথে মিশবো।
এই প্রথম বুঝতে পারলাম, এটা শুধু রাগ বা অভিমান নয়। বিশ্বাস করেন, এটা আমার অনুভব নয়—অনুধাবন। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি এভাবেই এই প্রক্রিয়া আমার স্বাধীনতাকে পর্যায়ক্রমে বা ধারাবাহিকভাবে ধ্বংস করার একটি পরিকল্পনা। অথচ আমি যে মানুষটি নিজে সার্জারি থিয়েটারে শত শত জীবন বাঁচাই, সে নিজের জীবনটাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। এই দ্বৈত সত্তার ভার আমি আর বহন করতে পারছি না। আমাকে সাহায্য করুন।”
নরম ও দৃঢ় স্বরে বললাম, “আপনার এই উপলব্ধিটাই সবচেয়ে বড় শক্তি। আপনি রোগী নন, আপনি সেই মানুষ যিনি নিজের সমস্যার জটগুলো একটা একটা করে খুলে দেখে নিজের চোখে আয়না ধরার সাহস জোগাড় করেছেন। এবার, আসুন আমরা দুজনে মিলে ট্রিটমেন্ট প্ল্যান তৈরি করব। আপনি একা নন।”
ঘটনার নারী তার জীবনসঙ্গী দ্বারা কোয়ারসিভ কন্ট্রোল–এ নিয়ন্ত্রিত হচ্ছেন। তিনি যা বললেন, এটাই কোয়ারসিভ কন্ট্রোলের প্রভাব।
স্টার্ক, ই. (২০০৯) সালে জবরদস্তিমূলক নিয়ন্ত্রণের পুনর্মূল্যায়ন, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা, [১৫(১২), ১৫০৯–১৫২৫] শীর্ষক প্রবন্ধে কোয়ারসিভ কন্ট্রোলের অপারেশনাল ডেফিনিশন নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন, যা ডিএসএম ও আইসিডি ফ্রেমওয়ার্কের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।
স্টার্কের জবরদস্তিমূলক নিয়ন্ত্রণ তত্ত্ব বলছে—এটি অদৃশ্য শিকল ও এক ভয়ের অনুভূতি তৈরি করে, যা একজন আক্রান্তের জীবনের সব দিক প্রভাবিত করে। এটি তাদের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়, কাজের ক্ষমতা কমিয়ে তাদের মানবাধিকার সীমিত করে।
বিশেষজ্ঞ ইভান স্টার্ক বলেন, জবরদস্তিমূলক নিয়ন্ত্রণ যেন জিম্মি করে রাখার মতো অবস্থা। ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর সহিংসতা কেবলমাত্র দৈহিক আঘাতের বিষয় নয়। এটি একটি ব্যবস্থাগত প্যাটার্ন বা কৌশল, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি অপরজনের ওপর ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। এর লক্ষ্য হলো শিকার ব্যক্তির স্বাধীন ইচ্ছা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে ধ্বংস করা। স্টার্ক একে “জনস্বাধীনতার অপরাধ” এবং জিম্মি করে রাখা বা সন্ত্রাসবাদের সাথে তুলনীয় একটি অবস্থা বলে বর্ণনা করেছেন।
জবরদস্তিমূলক নিয়ন্ত্রণ কোনো একক ঘটনা নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের ওপর চলমান নিয়ন্ত্রণের একটি জাল। শিকারকে দুর্বল ও আবদ্ধ করতে নিম্নলিখিত কৌশলগুলো ব্যবহৃত হয়:
• মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতন
• সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করা
• আর্থিক নিয়ন্ত্রণ
• হুমকি ও ভীতি প্রদর্শন
গবেষণায় দেখা গেছে, জবরদস্তিমূলক নিয়ন্ত্রণের শিকার ব্যক্তিরা অন্যান্য সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের তুলনায় আরও ঘনঘন ও মারাত্মক সহিংসতা এবং ভবিষ্যতে আরও সহিংসতার উচ্চ ঝুঁকির সম্মুখীন হন।
এই তত্ত্বটি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াসহ অনেক স্থানের আইন তৈরিতে প্রভাব ফেলেছে। সেখানে জবরদস্তিমূলক নিয়ন্ত্রণকে এখন গৃহ সহিংসতার সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং এর ভিত্তিতে নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশ দাবি করা যায়।
নানা গবেষণা থেকে বৈশ্বিক ও বাংলাদেশে জবরদস্তিমূলক নিয়ন্ত্রণ (কোয়ারসিভ কন্ট্রোল)-এর প্রাদুর্ভাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—নারীদের জীবনকালে ঘনিষ্ঠ সঙ্গী দ্বারা মানসিক নির্যাতনের প্রাদুর্ভাব ৩৬% থেকে ৮৫%। বিবিএস ভিএডব্লিউ সার্ভে ২০২২ অনুসারে, বাংলাদেশে ৬৮% বিবাহিত নারী তাদের স্বামীর কাছ থেকে নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের শিকার হন।
যদি আপনার সঙ্গীর মধ্যে এই সমস্যা থাকে:
১. স্বীকার করুন: আপনার নিজস্ব খারাপ লাগার অনুভূতিগুলো।
২. নিরাপদ কাউকে বলুন: বিশ্বস্ত বন্ধু/পরিবারের সদস্যকে জানান। এমন কাউকে বেছে নিন, যিনি ২০ বছর পরে আপনার সাথে কোনো কারণে বিরোধ হলে আজকের এই কথাগুলো প্রকাশ করবেন না।
৩. প্রমাণ রাখুন: গোপনে ডায়েরি লিখুন বা অডিও রেকর্ড রাখুন।
৪. হেল্পলাইনে ফোন করুন: জাতীয় হেল্পলাইন ১০৯ অথবা স্থানীয় নারী সংগঠনে যোগাযোগ করুন।
৫. পেশাদার সাহায্য নিন: মনস্তাত্ত্বিক বা আইনি পরামর্শ নিন।
৬. নিরাপত্তা পরিকল্পনা করুন: প্রয়োজনে চলে যাওয়ার পথ আগে থেকে ভাবুন। এই পরিকল্পনা ১ বছর পরে কী হবে, ৫ বছর পরে কীভাবে, ১০ বছর পরে কী হবে—এরকম ধাপে ধাপে হওয়া বাঞ্ছনীয়।
কোয়ারসিভ কন্ট্রোলের ফাঁদে আটকে থাকা নারীর মধ্যে নিম্নলিখিত লক্ষণগুলো স্পষ্ট:
• চরম বিচ্ছিন্নতা: “আমার কোনো নিজস্ব সম্পর্ক নেই। সব তাঁর অনুমতি সাপেক্ষে।”
• স্থির ভয় ও সতর্কতা: “তাঁর মেজাজ বুঝে চলতে হয় সারাদিন।”
• আত্ম–সন্দেহ: “আমার নিজের কোনো সিদ্ধান্তই আমি নিশ্চিত নই।”
• অর্থনৈতিক অসহায়ত্ব: “আমার হাতে নিজের কোনো টাকা নেই।”
• নিজের পরিচয় হারানো: “আমি আগে যেমন ছিলাম, সে মানুষটি আর নেই।”
ঘ) বেরিয়ে আসা নারীদের কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন?
জুডিথ লুইস হারম্যান, ‘ট্রমা অ্যান্ড রিকভারি’ গ্রন্থে বলেছেন—
“আঘাত সারানোর জন্য প্রথম প্রয়োজন একটি নিরাপদ সম্পর্ক।”
ট্রমা থেকে পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজন:
• ট্রমা–ইনফর্মড থেরাপি: যেখানে থেরাপিস্ট “আপনার অনুভূতি বৈধ”—এই বার্তা দেন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন।
• সাইকোএডুকেশন: তাকে বোঝানো যে তার লক্ষণগুলো “একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতির স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।”
• ক্ষমতায়নমূলক কাউন্সেলিং: তার লুকিয়ে থাকা শক্তি ও প্রতিরোধক্ষমতাকে চিনতে ও বিকাশে সাহায্য করা।
• গ্রুপ থেরাপি: যেখানে “আমি একা নই”—এই বোধ তৈরি হয় এবং লজ্জা দূর হয়।
• ব্যবহারিক জীবনদক্ষতা প্রশিক্ষণ: আর্থিক স্বাধীনতা ও স্বনির্ভরতার পথ দেখানো।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বহু বছর আগে লিখে গেছেন,
“গাহি সাম্যের গান—
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান…”
যারা অন্যের পছন্দকে মর্যাদা দেন, নিজের মত জোর করে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেন না—তাদের প্রতি সশ্রদ্ধ ভালোবাসা।
লেখক: চিকিৎসক, কাউন্সিলর, সাইকোথেরাপি
প্র্যাকটিশনার; ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার, বাংলাদেশ।