দীপ্ত নিউজ
ফিচার

সবচেয়ে অলস প্রাণীর গল্প

ফরিদুল ইসলাম
ফরিদুল ইসলাম
প্রকাশ:
সবচেয়ে অলস প্রাণীর গল্প
ছবি: সংগৃহীত

গতিময় এই আধুনিক যুগে আমরা যেন অবিরাম ছোটাছুটির মধ্যে আছি। সময় বাঁচাতে, জীবনকে এগিয়ে নিতে কত কৌশলই না খুঁজি আমরা! অথচ আমাদের এই পৃথিবীতে এমন এক প্রাণী রয়েছে, যে সমস্ত ব্যস্ততাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিব্যি কাটিয়ে দিচ্ছে পরম আয়েশি এক জীবন। বলছিলাম বনের সবচেয়ে ধীরগতির ও অলস প্রাণী ‘শ্লথ’–এর কথা।

শ্লথ মানেই রাজকীয় অলসতা

শ্লথ মূলত মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার রেইনফরেস্ট বা গভীর বনাঞ্চলের প্রাণী। তাদের পুরো জীবনটাই কাটে গাছের ডালে ঝুলে ঝুলে। এরা এতটাই অলস যে, গাছ থেকে মাটিতে নামতেও তাদের অনীহা কাজ করে। সাধারণত সপ্তাহে মাত্র একবার প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বা অন্য কোনো গাছে যাওয়ার জন্য তারা কদাচিৎ নিচে নামে। খাওয়ার সময়, ঘুমানোর সময়, এমনকি প্রজনন প্রক্রিয়া—সবকিছুই সম্পন্ন হয় ওই গাছের ডালে উল্টো হয়ে ঝুলেই।

কতটা ধীরগতির তারা?

শ্লথকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে ধীরগতির স্তন্যপায়ী প্রাণী। ভূমিতে এদের গতি ঘণ্টায় মাত্র ০.১৫ থেকে ০.২৪ কিলোমিটার! অর্থাৎ, মাত্র এক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে একটি শ্লথের আস্ত একটা দিন বা তারও বেশি সময় লেগে যেতে পারে।

খাবার হজম হতে লাগে পুরো এক মাস!

শ্লথের এই চরম অলসতার পেছনের প্রধান রহস্য তাদের শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া বা অত্যন্ত মন্থর মেটাবলিজম। এরা মূলত গাছের কচি পাতা, কুঁড়ি ও ডালপালা খেয়ে বেঁচে থাকে। কিন্তু মজার ও অবাক করার ব্যাপার হলো, শ্লথের চারকক্ষ বিশিষ্ট জটিল পাকস্থলীতে একটি পাতা সম্পূর্ণ হজম হতে প্রায় এক মাস সময় নেয়! পেটে সবসময় খাবার হজম হওয়ার ধীর প্রক্রিয়ায় থাকায় তাদের শরীরে শক্তির জোগান থাকে খুব কম। আর এই কম শক্তির কারণেই তারা কখনো দৌড়াতে পারে না, এমনকি দ্রুত নড়াচড়াও করতে পারে না।

ঘুমেই কাটে অর্ধেক জীবন

সাধারণ ধারণা থাকে, অলস প্রাণীরা বুঝি সারাদিন শুধু ঘুমিয়েই কাটায়। বন্য পরিবেশে শ্লথ সাধারণত দিনে ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টা ঘুমায়। তবে বন্দিদশায় বা চিড়িয়াখানায় এদের অলসতা আরও বেড়ে যায় এবং ঘুমের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত! বাকি সময়টুকু তারা গাছের ডালে ঝুলে ঝুলে অলস দৃষ্টিতে চারপাশ দেখতে দেখতে পার করে দেয়।

এত ধীরগতির পরও কেন টিকে আছে তারা?

প্রশ্ন জাগতে পারে, এত ধীরে চলা এবং আত্মরক্ষার জন্য দৌড়ানোর সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বেও শ্লথ কীভাবে বন্যপ্রাণীর নিষ্ঠুর দুনিয়ায় টিকে আছে? প্রকৃতির এক চমৎকার আশীর্বাদ হলো এদের ছদ্মবেশ ধারণের ক্ষমতা। শ্লথের লোমে এক ধরনের সবুজ রঙের শৈবাল (Algae) জন্মায়, যা বর্ষাকালে এদের শরীরের রঙকে গাছের পাতার মতো সবুজ করে তোলে। ফলে বনের মাঝে শিকারী প্রাণীরা এদের সহজে খুঁজে পায় না। তাছাড়া, বাঘ বা ঈগলের মতো শিকারীদের চোখে পড়ার ভয়ে এরা সবসময় খুব সাবধানে ও নিঃশব্দে থাকে। বিপদে পড়লে এরা নিজেদের শক্তিশালী ও ধারালো নখ দিয়ে আক্রমণ প্রতিহত করার চেষ্টা করে, আর অবাক করা বিষয় হলো—শ্লথ দারুণ সাঁতারও কাটতে পারে!

প্রকৃতির এই শান্ত স্বভাবের ও ধীরগতির প্রাণীটি আমাদের যেন এক অন্যরকম বার্তা দেয়—জীবনের সব ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় ছোটাই সব নয়, মাঝে মাঝে একটু থেমে, নিজের গতিতে বেঁচে থাকাও জীবনের অংশ হতে পারে।