নেদারল্যান্ডস ও বাংলাদেশের মধ্যকার সহযোগিতা সরকারি–বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে সারা বাংলাদেশের মানুষ, বিশেষ করে জলবায়ু–ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ খাবার পানির প্রাপ্যতা বাড়াতে পারে বলে জানিয়েছেন ডাচ রাষ্ট্রদূত ইয়োরিস ভ্যান বোমেল।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বরিশাল জেলায় ম্যাক্স ফাউন্ডেশনের ‘বিল্ডিং ওয়াটার বিজনেস’ কর্মসূচি পরিদর্শনের সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।
জলবায়ু–ঝুঁকির প্রেক্ষাপটে স্মার্ট, স্বল্প রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের পাইপলাইনযুক্ত পানি সরবরাহ ব্যবস্থা কীভাবে দক্ষতার সঙ্গে কার্যক্রম পরিচালনা করছে তা দেখতে রাষ্ট্রদূত জেলার বাকেরগঞ্জের দুধলমৌতে এ কর্মসূচি পরিদর্শন করেন।
ইয়োরিস ভ্যান বোমেল বলেন, পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে অনেক মিল রয়েছে, কারণ উভয় দেশই ব–দ্বীপ, নদী ও সমুদ্র দ্বারা গঠিত। তিনি জোর দিয়ে বলেন, পানি সহযোগিতার মাধ্যমে সকলের জন্য খাবার পানির প্রাপ্যতাও নিশ্চিত করা উচিত।
রাষ্ট্রদূত বলেন, ম্যাক্স ফাউন্ডেশন এবং ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে তার এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল, পানি সংযোগের “শেষ প্রান্তে” কীভাবে পৌঁছানো যায় তা খতিয়ে দেখা, যাতে স্থানীয় জনগোষ্ঠী তাদের বাড়িতে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি পায়।
তিনি বলেন, শুধু খাবার পানির গুণগত মান উন্নয়নের জন্যই নয়, বরং পানি সংগ্রহের জন্য প্রায়শই অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হয় এমন নারী ও মেয়েদের ওপর থেকে বোঝা কমানোর জন্যও ট্যাপের পানির সহজলভ্যতা গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রদূত বলেন, বরিশালের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে যে সরকার, স্থানীয় জনগোষ্ঠি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সহযোগিতার মাধ্যমে টেকসই পানি পরিষেবা গড়ে তোলা সম্ভব।
তিনি বলেন, “আমরা আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি যে, সরকারি–বেসরকারি অংশীদারিত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি টেকসই সমাধান, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবার ঘরে পানির সুবিধা পাবে এবং তা সাশ্রয়ীও হবে।”
তিনি আরও বলেন, বরিশালের অফ–গ্রিড পানি সরবরাহ ব্যবস্থা পরিদর্শন কমিউনিটি পর্যায়ে এই ধরনের ব্যবস্থাগুলো কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে তা দেখারও একটি সুযোগ করে দিয়েছে।
পানির সহজলভ্যতা বাড়াতে ম্যাক্স ফাউন্ডেশন এবং ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্থানীয় জনগোষ্টি ও কোম্পানিগুলোর সাথে নেদারল্যান্ডসের কাজ দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন ইয়োরিস ভ্যান বোমেল।
তিনি বলেন, “আমরা যদি কোম্পানি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠির সঙ্গে কাজ করি, তবে আমরা একটি পরিবর্তন আনতে পারবো।”
ম্যাক্স ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক জোক লে পুল বলেন, সংস্থাটি দুই দশকেরও বেশি সময় আগে কাজ শুরু করে এবং প্রাথমিকভাবে সংস্থার মনোযোগ ছিল শিশু মৃত্যু প্রতিরোধের অপরিহার্য উপায় হিসেবে পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির ওপর।
তিনি বলেন, উচ্চ চাহিদা ও জনঘনত্বের কারণে সংস্থাটি বাংলাদেশকে বেছে নেয় এবং বরিশালে পানির কূপ দিয়ে তাদের কাজ শুরু করে। তিনি উল্লেখ করেন, সেই কূপগুলোর মধ্যে অনেকগুলো ১৫ থেকে ২০ বছর পরেও সচল রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, তবে মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ার সাথে সাথে তারা পানির উন্নত সরবরাহ পাওয়ার আকাঙ্খা ব্যক্ত করতে শুরু করে। বাড়িতে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ উল্লেখযোগ্য স্বাস্থ্য সুবিধা বয়ে আনতে পারে এবং মানুষ এই ধরনের পরিষেবার জন্য অর্থ ব্যয়ে ইচ্ছুক।
ম্যাক্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ও নেপাল কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. এটিএম তারিকুল ইসলাম বলেন, ম্যাক্স ফাউন্ডেশন এবং ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ বরিশাল ও পটুয়াখালীতে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানীয় জলের জন্য একটি ব্যবসাভিত্তিক সমাধান তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, সাহায্য বা অনুদান–নির্ভর প্রকল্পের বিপরীতে এই মডেলটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে পানির জন্য পরিবারগুলোর দেওয়া মাসিক অর্থের মাধ্যমে এটি পরিচালনা করা যায়।
তিনি আরও বলেন, এই উদ্যোগটি এ পর্যন্ত প্রায় ১০০টি ওয়াটার গ্রিড স্থাপন করেছে এবং পরিচালন ব্যয় কমাতে ও ব্যবসাগুলোকে আর্থিকভাবে আরও টেকসই করতে পর্যায়ক্রমে সৌরশক্তি ও অটোমেশনের মতো ব্যবস্থা চালু করছে।
ড. তারিকুল জানান, পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি পাওয়ার ব্যবস্থা ত্বক ও পেটের রোগ কমাতেও অবদান রেখেছে, পাশাপাশি নারীরা পানি সংগ্রহের জন্য কম দূরত্ব এবং বাড়ির শৌচাগার ও ধোয়ামোছার সুবিধা থেকে উপকৃত হচ্ছেন।
পরিদর্শনকালে অন্যান্যের মধ্যে ডাচ দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি (পানি ও জলবায়ু) ক্লাসেন ইঙ্গে, সিনিয়র ফাইনান্সিয়াল অ্যাডভাইজার আমিনুল ইসলাম এবং ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়ামিন ফারুক উপস্থিত ছিলেন।
মাসউদ/এসএ