শুক্রবার, এপ্রিল ১০, ২০২৬
শুক্রবার, এপ্রিল ১০, ২০২৬

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের স্মরণসভা অনুষ্ঠিত

Avatar photoদীপ্ত নিউজ ডেস্ক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক চেয়ারপারসন এবং ডিইউএমসিজেএএ’র প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

শুক্রবার (১০ এপ্রিল) বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার আর্টস মিলনায়তনে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে তাঁর সহধর্মিণী, পরিবারের সদস্য, বিভাগের সহকর্মী এবং সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা এই অধ্যাপকের নানা স্মৃতি নিয়ে কথা বলেন।

বেলা সোয়া তিনটার দিকে এক মিনিট নীরবতা পালন এবং অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের প্রিয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে স্মরণসভা শুরু হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. শামসুল হক এবং সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক মীর মাসরুরুজ্জামান।

স্মরণসভায় বক্তারা অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানকে একজন প্রাজ্ঞ শিক্ষক, মানবিক মানুষ এবং সাংবাদিকতা শিক্ষার পথিকৃৎ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁরা বলেন, অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের হাত ধরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে স্নাতক কোর্স প্রবর্তিত হয় এবং তিনি এই শিক্ষার একটি শক্ত ভিত্তি স্থাপন করে গেছেন।

বক্তারা আরও বলেন, অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান ছিলেন একজন ‘আমৃত্যু শিক্ষক’, যিনি সব সময় শিক্ষার্থীদের পাশে থেকেছেন। তাঁর জীবনদর্শন, মানবিকতা ও শিক্ষাদানের গুণাবলি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান সাংবাদিকতায় নৈতিকতা, মানবিকতা এবং শান্তির দর্শন শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে মন্তব্য করেন গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া কমিউনিকেশন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. অলিউর রহমান। তিনি বলেন, অধ্যাপক সাখাওয়াত শিক্ষার্থীদের চিন্তা করতে শেখাতেন এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন করতেন। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করেই আগামী প্রজন্মকে এগিয়ে যেতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অধ্যাপক সাখাওয়াতের শিক্ষার্থী শাহানা হুদা রঞ্জনা বলেন, ‘স্যারকে আমি আগে পেয়েছি আমার বাল্যবন্ধু সুমনার বাবা হিসেবে। সেই ছোটবেলা থেকেই আমি ওই বাসায় বড় হয়েছি। সেই সময় আমরা যে শিক্ষকদের পেয়েছিলাম তাঁরা ছিলেন আমাদের বন্ধুর মতো। স্যার অনেক সিনিয়র হওয়া সত্ত্বেও কখনো এমন মনে হয়নি যে উনাকে এটা বলা যাবে না। তিনি সময়মতো ক্লাসে আসতেন। দুই ঘণ্টা ক্লাস নিলেও কেউ বোরিং হতো না। উনি এডিটিং পড়াতে গিয়ে রিপোর্টিং, উনার দৈনিক বাংলার অভিজ্ঞতা এবং দেশের ইতিহাস টেনে আনতেন।’

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. মফিজুর রহমান বলেন, অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের অসাধারণ যোগাযোগ দক্ষতা ছিল, যার মাধ্যমে তিনি সহজেই শিক্ষার্থীদের মন জয় করতে পারতেন। তিনি তত্ত্ব ও প্রয়োগের মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে সাংবাদিকতার শিক্ষাকে আরও কার্যকর করে তুলেছিলেন। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস তিনি অত্যন্ত সহজভাবে ব্যাখ্যা করতেন।’ তিনি ‘আমৃত্যু শিক্ষক’ ছিলেন উল্লেখ করে অধ্যাপক মফিজুর রহমান বলেন, পড়াশোনা বা শিক্ষকতা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ে ফোন করলে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত সহজভাবে বুঝিয়ে বলতেন।

অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের কন্যা সুমনা শারমিন বর্তমানে দৈনিক প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক। তাঁর বক্তব্যের সময় অনেকেই আবেগাপ্লুত হন। তিনি বলেন, ‘আমার বাবার মনের একটি বড় অংশজুড়ে ছিল তাঁর ছাত্রছাত্রীরা। অসুস্থ হওয়ার মাত্র দুদিন আগেও তিনি ক্লাস নিয়েছেন। আইসিইউর ভিতরে তখন উনি আমাকে বলেছিলেন, “আমি তো কটা দিন একটু ক্লাস নিতে পারব না। এটা ছেলে মেয়েদেরকে একটু জানাতে হবে।” ’ তিনি তাঁর বাবার অসাধারণ ধৈর্য, মানবিকতা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি গভীর ভালোবাসার কথা তুলে ধরেন।

স্মরণসভায় অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের সহধর্মিণী মালেকা খান বলেন, ‘এই মানুষটা আমার হাতে ধরে আমাকে সামনে তুলে ধরে আমাকে সম্পূর্ণ করতে কাজ করেছেন।’ মালেকা খানের ভাইকে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কুমিল্লায় গুলি করে হত্যা করে। সেই সূত্রে তাঁদের পরিবারটি মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত বিষয়ে পরবর্তীতে নানাভাবে কাজ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পর নির্যাতিত নারীদের সহায়তায় অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের অবদানের কথা উল্লেখ করে তাঁর স্ত্রী বলেন, ‘৭১এ পাকিস্তানিরা মেয়েদের ওপর যে অত্যাচার করেছে, সেই নির্যাতিত মেয়েদের উদ্ধার ও সেবা করার জন্য তিনি একটি সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন—যার নাম ছিল কেন্দ্রীয় নারী পুনর্বাসন সংস্থা। এই কাজে কবি সুফিয়া কামাল ও বদরুন্নেসা আহমেদও যুক্ত ছিলেন।’

স্মরণসভায় অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের নামে একটি ট্রাস্ট ফান্ড গঠন, স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ এবং বৃত্তি চালুর প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়।

সমাপনী বক্তব্যে ডিইউএমসিজেএএ’র সভাপতি মো. শামসুল হক বলেন, ‘অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের কর্মময় জীবন আমাদের জন্য পথের পাথেয় হয়ে থাকবে। তাঁর মানবিক ও পেশাগত আদর্শ নতুন প্রজন্ম ধারণ করবে বলে আমরা আশা করি।’

স্মৃতিচারণ শেষে অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।

আরও পড়ুন

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More