সোমবার, মার্চ ১৬, ২০২৬
সোমবার, মার্চ ১৬, ২০২৬

চুয়াডাঙ্গার যে মসজিদ প্রথম আজানের সুর ধ্বনিত হয়েছিল

Avatar photoদীপ্ত নিউজ ডেস্ক
ঐতিহাসিক নিদর্শন ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে পরিচিত তিন গম্বুজ বিশিষ্ট চুয়াডাঙ্গার বড় মসজিদ

ঐতিহাসিক নিদর্শন ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে পরিচিত তিন গম্বুজ বিশিষ্ট চুয়াডাঙ্গার বড় মসজিদ। স্থানীয় মুসল্লি ও এলাকাবাসীর কাছে এটি গর্বের একটি নাম। প্রায় আড়াইশো বছরের পুরোনো এ মসজিদটি স্থাপিত হয় ১২০৮ হিজরি, আনুমানিক ১৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দে। দীর্ঘ সময় ধরে এটি শুধু ইবাদতের স্থানই নয় বরং সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।

মসজিদের মুসল্লিদের কাছ থেকে জানা যায়, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই মসজিদটি এলাকায় ইসলামি শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশেও মসজিদটি তার ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখে দাঁড়িয়ে আছে।

১৭৮৬ সালে কুসুম বিবি নামের এক মহীয়সী নারী ৭৩ শতক জমির ওপর নিজ অর্থায়নে মসজিদটি নির্মাণ করেন। তৎকালীন সময়ে চুয়াডাঙ্গা শহরের মধ্যে এটিই ছিল প্রথম মসজিদ। এই মসজিদ থেকেই চুয়াডাঙ্গায় প্রথম আজানের সুর ধ্বনিত হয়েছিল।

বর্তমানে মসজিদটিতে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও কিছু কিছু অংশে সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। মসজিদের নাম অনুসারেই মহল্লাটির নামকরণ হয়েছে মসজিদপাড়া। চুয়াডাঙ্গা শহরের প্রাণকেন্দ্র একাডেমি মোড় সংলগ্ন স্থানে অবস্থিত এ ঐতিহ্যবাহী বড় মসজিদ।

শুরুর দিকে মসজিদের ভেতরে দুটি কাতার ও বারান্দায় একটি কাতারে নামাজ আদায় করা যেত। সেই সময় প্রায় ৭০ জন মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারতেন। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মসজিদটি সম্প্রসারণ করা হয়।

১৪৩৫ হিজরি ও ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে মূল অবকাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে মসজিদটির সংস্কার কাজ করা হয়। সংস্কারের মাধ্যমে এর অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নামাজের জায়গা সম্প্রসারণ এবং নান্দনিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হয়। ফলে বর্তমানে এটি আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন একটি বৃহৎ জামে মসজিদ হিসেবে মুসল্লিদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

বড় মসজিদ বা মিনার মসজিদ নামেও মসজিদটি পরিচিত। এর সুউচ্চ মিনার অনেক দূর থেকেই দেখা যায়। তবে বর্তমানে মসজিদের মিনারের তৃতীয় তলার বেলকুনির অংশ ভেঙে গেছে। মসজিদের মিনারটি সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় মুসল্লিরা।

মসজিদের পাশেই রয়েছে একটি কবরস্থান। এই বড় মসজিদে রেলপাড়া, মসজিদপাড়া, একাডেমি মোড়, জোয়ার্দ্দার পাড়া, বাগানপাড়া, মাঝেরপাড়া, মল্লিকপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার মুসল্লিরা নামাজ আদায় করতে আসেন। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পাশাপাশি জুমার নামাজে বিপুল সংখ্যক মুসল্লির সমাগম ঘটে। এছাড়া ধর্মীয় অনুষ্ঠান, মিলাদ মাহফিল ও কোরআন তিলাওয়াতের আসরেও মসজিদ প্রাঙ্গণ মুখরিত থাকে।

মসজিদ কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ ইবরুল হাসান জোয়ার্দ্দার বলেন, চুয়াডাঙ্গা বড় মসজিদের ইতিহাসে কুসুম বিবির নাম গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। এই মসজিদের জমির মূল মালিক ছিলেন পরোপকারী ও ধর্মপ্রাণ নারী কুসুম বিবি। তিনি ৭৩ শতক জমি আল্লাহর ঘর নির্মাণের জন্য দান করেন।

এলাকাবাসীর মুখে মুখে প্রচলিত আছে, কুসুম বিবি অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন এবং মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত রাখতেন। লোককথা অনুযায়ী, নিজের বাড়ি নির্মাণের সময় তিনি মাটির নিচে পাঁচ থেকে ছয় কলসি মোহর খুঁজে পান। বিপুল সম্পদ পেয়ে তিনি ব্যক্তিগত ভোগবিলাসে না গিয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে পরামর্শ করেন এই মোহর কী কাজে ব্যয় করা যায়। তখন এলাকার ধর্মপ্রাণ মানুষরা তাঁকে পরামর্শ দেন, এই অর্থ দিয়ে একটি মসজিদ নির্মাণ করলে তা হবে সদকায়ে জারিয়া, যার সওয়াব চিরকাল প্রবাহিত হবে।

সেই পরামর্শ হৃদয়ে ধারণ করে কুসুম বিবি নিজের অর্থায়নে মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। শোনা যায়, সে সময় নির্মাণকাজে ডিমের কুসুম ও সুরকির মিশ্রণ ব্যবহার করে মসজিদের ভিত্তি ও দেয়াল তৈরি করা হয়, যা সেই যুগের নির্মাণশৈলীর একটি অনন্য উদাহরণ। তাঁর আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও ধর্মীয় অনুরাগের ফলস্বরূপ নির্মিত হয় চুয়াডাঙ্গার ঐতিহ্যবাহী বড় মসজিদ।

প্রথম দিকে এই মসজিদে একসঙ্গে তিন কাতারে দাঁড়িয়ে প্রায় ৭০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারতেন। সময়ের পরিবর্তন ও মুসল্লিদের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মসজিদটির পরিসর বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দেয়। পরবর্তীতে ২০০০ সালে মসজিদটি পুনরায় সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়। আধুনিকায়নের মাধ্যমে বর্তমানে এই মসজিদে একসঙ্গে প্রায় ৭০০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।

মসজিদ কমিটির সেক্রেটারি মোহাম্মদ জামির হাসান জোয়ার্দ্দার বলেন, ১৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দে এই ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি নির্মিত হয়। দীর্ঘ দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এটি এলাকাবাসীর ইবাদত বন্দেগি ও ধর্মীয় চর্চার কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।


তিনি বলেন, কুসুম বিবি নামে এক মহীয়সী ও ধর্মপ্রাণ নারী আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় এই মসজিদের জন্য জমি দান করেছিলেন। বর্তমানে মসজিদের নামে মোট ৭৩ শতক জমি রয়েছে। আমাদের জানা মতে, বর্তমান সভাপতির পূর্বপুরুষরাই ছিলেন এই মসজিদের প্রধান দাতা ও পৃষ্ঠপোষক। তাঁদের অবদান ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় মসজিদটি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত টিকে আছে এবং ক্রমান্বয়ে সমৃদ্ধ হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ২০১৪ সালে মুসল্লি ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় মসজিদটি পুনরায় সংস্কার করা হয়। সে সময় মসজিদের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নামাজের স্থান সম্প্রসারণ এবং সৌন্দর্যবর্ধনের বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করা হয়। তবে এখনও কিছু কাজ বাকি রয়েছে, যেমন মিনারের উন্নয়ন, অজুখানার আধুনিকায়ন ও সীমানা প্রাচীরের সংস্কার। ধীরে ধীরে মুসল্লি ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় অবশিষ্ট কাজগুলো সম্পন্ন করা হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। ভবিষ্যতে মসজিদটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী শিক্ষা ও ধর্মীয় কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।

মসজিদ কমিটির সাবেক সেক্রেটারি মোহাম্মদ রিপন মণ্ডল বলেন, চুয়াডাঙ্গা বড় মসজিদ কেবল একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটি একটি দীর্ঘ সামাজিক ও ঐতিহাসিক যাত্রার সাক্ষী। সময়ের পরিক্রমায় নানা পরিবর্তন, সংস্কার ও সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে এই মসজিদ।

তিনি বলেন, প্রাচীন স্থাপত্যধারা ও আধুনিক নির্মাণশৈলীর সমন্বয়ে এটি এখন এলাকাবাসীর গর্বের প্রতীক। প্রাথমিক পর্যায়ে এটি ছিল অপেক্ষাকৃত ছোট পরিসরের একটি ইবাদতখানা, যেখানে স্থানীয় মুসল্লিরা নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন। ক্রমে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের বিস্তারের ফলে মসজিদটির পরিধি বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দেয়। এলাকাবাসীর সম্মিলিত উদ্যোগ, দান ও পরিশ্রমের মাধ্যমে ধাপে ধাপে এর সম্প্রসারণ সম্পন্ন হয়।

মসজিদের মুয়াজ্জিন মোহাম্মদ শাহাবুদ্দীন বলেন, আমি ২০১২ সাল থেকে এই মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এটি আমাদের এলাকার ইবাদত ও ধর্মীয় চর্চার কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এই মসজিদটি প্রতিষ্ঠার পেছনে কুসুম বিবি নামক এক মহীয়সী ও ধর্মপ্রাণ নারীর দানের অবদান ছিল অত্যন্ত মহৎ। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে তিনি যে জমি দান করেছিলেন, তারই ফলস্বরূপ আজ আমরা এখানে আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করতে পারছি।

মসজিদপাড়ার প্রবীণ ব্যক্তিত্ব খলিলুর রহমান বলেন, ছোটবেলায় এই মসজিদ প্রাঙ্গনেই অনেক খেলাধুলা করেছি। আমার ছেলেবেলার স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই মসজিদ। আগে মসজিদটির নকশা ছিল টালির মতো সরল, কিন্তু এখন এটি আধুনিকতার ছোঁয়ায় সমৃদ্ধ হয়েছে।

তিনি বলেন, মসজিদটি তৎকালীন মুঘল আমলের মসজিদের আদলে নির্মিত। এর চুনসুরকির গাঁথুনি সেই সময়ের নান্দনিক স্থাপত্যের পরিচয় বহন করে। আমাদের ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে, যেখানে সংস্কারের মাধ্যমে আগের সৌন্দর্য ও আধ্যাত্মিকতার সংমিশ্রণ ঘটানো হয়েছে। এভাবেই মসজিদটি যুগের পর যুগ টিকে থাকবে এবং নতুন প্রজন্ম এর ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে।

আরও পড়ুন

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More